বাংলাদেশ—প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের এক অপরূপ মেলবন্ধন। এই দেশের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে অসাধারণ সব জায়গা, যা পর্যটকদের মন আকর্ষণ করে অবলীলায়। যারা ভ্রমণপ্রেমী, তাদের জন্য বাংলাদেশ যেন এক অপার সম্ভাবনার ভূখণ্ড/Tourist Places । চলুন এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও হৃদয়স্পর্শী কিছু Tourist Places এর কথা, যেগুলো আপনার পরবর্তী ভ্রমণ তালিকায় অবশ্যই যুক্ত হওয়া উচিত।
১. কক্সবাজার: পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত
২. সেন্ট মার্টিন্স আইল্যান্ড: শান্তির প্রবাল দ্বীপ
৩. সুন্দরবন: রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজ্য
৪. সাজেক ভ্যালি: মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া
৫. জাফলং: পাথর আর জলরাশি মিলে আঁকা স্বপ্ন
৬. রাঙ্গামাটি: কাপ্তাই লেকের রূপকথা
৭. সোনারগাঁও: বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের শহর
৮. বান্দরবান: পাহাড় আর ঝর্ণার স্বর্গভূমি
৯. পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
১০. কুয়াকাটা: সাগরে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অনন্য দৃশ্য
১. কক্সবাজার: পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ( Tourist Places)

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জন্য বিশ্বখ্যাত। এখানে প্রায় ১২০ কিলোমিটার লম্বা বিস্তৃত বালুকাময় সৈকত রয়েছে। লাবণী বিচ, হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানী বিচ ও মেরিন ড্রাইভ রোড ঘুরে দেখার মতো অসাধারণ স্থান। সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য এবং টাটকা সামুদ্রিক খাবার কক্সবাজারের বিশেষ আকর্ষণ।
কেন যাবেন?
বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সৈকতের অভিজ্ঞতা নিতে কক্সবাজারের বিকল্প নেই। সূর্যাস্তের লালাভ আভা আর নরম বালির ওপর নগ্ন পায়ে হেঁটে চলার মাদকতা আপনাকে বারবার টানবে।
কি দেখবেন?
লাবণী বিচের সকাল
হিমছড়ি ঝর্ণার রহস্য
ইনানী বিচের পাথুরে সৌন্দর্য
মেরিন ড্রাইভের মনোমুগ্ধকর রাস্তা
ভ্রমণ টিপস:
ভোরের দিকে সৈকতে হাঁটলে সবচেয়ে সুন্দর আলো আর ফ্রেশ বাতাস পাবেন। স্থানীয় সামুদ্রিক খাবার (বিশেষ করে ‘ফিশ ফ্রাই’) ট্রাই করতে ভুলবেন না।
২. সেন্ট মার্টিন্স আইল্যান্ড: শান্তির প্রবাল দ্বীপ (Tourist Places)

“নীল জল আর নির্জনতা যেখানে এক হয়ে যায়, সেখানে মন পায় প্রকৃত মুক্তি।” কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে সমুদ্রপথে পৌঁছানো যায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন্সে। নীল জলরাশি, সাদা বালুর সৈকত এবং প্রবাল পাথরের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য দ্বীপটিকে অনন্য করে তুলেছে। এখানে চেরাডাং বিচ, রাতের আকাশে তারাভরা দৃশ্য ও সাইকেল ভ্রমণ খুবই জনপ্রিয়।
কেন যাবেন?
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপে নীল জলের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে হলে সেন্ট মার্টিন্সের চেয়ে ভালো আর কিছু নেই।
কি দেখবেন?
সূর্যাস্তের জাদু
নৌকা চড়ে চেরাডাং বিচ ভ্রমণ
প্রবাল পাথরের জগৎ
রাতের আকাশে মিল্কিওয়ে দেখা
ভ্রমণ টিপস:
দিনের বেলায় দ্বীপের চারদিকে সাইকেল ভ্রমণ করুন। অফ-সিজনে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) গেলে ভিড় কম পাবেন।
৩. সুন্দরবন: রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজ্য (Tourist Places)

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার অংশজুড়ে বিস্তৃত। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হওয়ার পাশাপাশি এখানে আছে কটকা বনাঞ্চল, দুবলার চর, হারবাড়িয়া ইকো পার্কসহ অসংখ্য নদী ও খাল। নৌকাভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও বন্যজীবন উপভোগ করা যায়।
কেন যাবেন?
রহস্যময় জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে চলা নদী আর হাজারো প্রাণের বাসস্থান সুন্দরবন যেন জীবনের এক অন্যরকম চমক।
কি দেখবেন?
কটকার জঙ্গলে টাইগার ট্র্যাকিং
দুবলার চর: শুটকি পল্লীর অভিজ্ঞতা
হারবাড়িয়া ইকো পার্ক
ভোরের কুয়াশায় নদীর উপর দিয়ে নৌকা ভ্রমণ
ভ্রমণ টিপস:
সেফটি মেনে অনুমোদিত ট্যুর গাইডের সঙ্গে সুন্দরবন ভ্রমণ করুন। মশা ও পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য সঠিক প্রস্তুতি নিন।
৪. সাজেক ভ্যালি: মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া

রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশে মেঘের রাজ্য নামে পরিচিত। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই উপত্যকায় রুইলুই এবং কংলাক গ্রামের জীবনযাত্রা, হেলিপ্যাড থেকে বিস্তৃত পাহাড়ি দৃশ্য এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মোহময় সৌন্দর্য আকর্ষণ করে পর্যটকদের।
“সাজেকে ভোরের প্রথম আলো দেখলে, মনে হবে—এটাই স্বর্গ।”
কেন যাবেন?
বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম সাজেক—যেখানে মেঘেরা হাতছানি দিয়ে ডাকে।
কি দেখবেন?
কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যোদয়
রুইলুই গ্রামের আদিবাসী জীবন
হেলিপ্যাডের ওপেন ভিউ
সাজেকের রঙিন কাঠের কটেজ
ভ্রমণ টিপস:
নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় সাজেক ভ্রমণের জন্য আদর্শ। সাথে গরম পোশাক রাখা জরুরি।
৫. জাফলং: পাথর আর জলরাশির এক

সিলেট জেলার গোয়াইনঘাটে অবস্থিত জাফলং পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলের জন্য বিখ্যাত। দূরের খাসিয়া পাহাড়, নদীতে পাথর উত্তোলন এবং খাসিয়া আদিবাসীদের জীবনধারা এখানে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। বর্ষার মৌসুমে ঝর্ণা ও নদীর যৌবনকাল দেখার জন্য আদর্শ স্থান।
কেন যাবেন?
স্বচ্ছ নদী, পাথরের ঘূর্ণি আর দূরের পাহাড় মিলে জাফলং হয়ে উঠেছে প্রকৃতির এক আশ্চর্য চিত্রপট।
কি দেখবেন?
পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলধারা
ডাউকি নদীর ভারতীয় সীমান্ত দেখা
খাসিয়া আদিবাসীদের বসতি
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট (নৈকট্যে)
ভ্রমণ টিপস:
বর্ষাকালে জাফলং ঘুরতে গেলে নদীর জলরাশি ও পাহাড়ের ঝরনা এক অনন্য রূপ দেখায়। নৌকাভ্রমণ মিস করবেন না।
৬. রাঙ্গামাটি: কাপ্তাই লেকের রূপকথা

চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙ্গামাটি শহর তার মনোরম কাপ্তাই হ্রদের জন্য পরিচিত। ঝুলন্ত সেতু, শুভলং ঝর্ণা এবং লেকের ওপরে নৌকাভ্রমণ এই অঞ্চলের বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া পাহাড়ি উপজাতি সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প পর্যটকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
“যেখানে জলরাশি আর পাহাড়ের চূড়া একত্র হয়, সেখানে জন্ম নেয় রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য।”
কেন যাবেন?
রাঙ্গামাটি মানেই শান্ত জলের উপর পাহাড়ের ছায়া। প্রকৃতি আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন।
কি দেখবেন?
ঝুলন্ত ব্রিজ
শুভলং ঝর্ণা
কাপ্তাই লেকের নৌকা ভ্রমণ
চাংপাং আদিবাসীদের গ্রাম
ভ্রমণ টিপস:
কাপ্তাই লেকে সূর্যাস্তের সময় নৌকায় থাকলে দারুণ ছবি তুলতে পারবেন। স্থানীয় উপজাতিদের হস্তশিল্প কেনার সুযোগও পাবেন।
৭. সোনারগাঁও: বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের শহর

ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও ছিল মধ্যযুগীয় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক পানাম নগর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং বারদি লোকনাথ আশ্রম। পুরনো স্থাপত্য আর লোকশিল্পের সংমিশ্রণে ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে সোনারগাঁও এক বিশেষ স্থান।
কেন যাবেন?
ইতিহাস আর সংস্কৃতির ভাণ্ডার দেখতে চাইলে সোনারগাঁও আপনার জন্য আদর্শ।
কি দেখবেন?
পানাম নগরের শতাব্দী পুরোনো বাড়ি
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন
বারদি লোকনাথ আশ্রম
মেঘনার ঘাটের মনোরম পরিবেশ
ভ্রমণ টিপস:
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গেলে একটু বেশি ভিড় হয়, তাই সকালে তাড়াতাড়ি গেলে আরামদায়ক ভ্রমণ হবে।
৮. বান্দরবান: পাহাড় আর ঝর্ণার স্বর্গভূমি

চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের পাহাড়ি সৌন্দর্যের লুকায়িত রত্ন। এখানে নাফাখুম ঝর্ণা, নীলগিরি ট্যুরিস্ট স্পট, বগা লেক ও চিম্বুক পাহাড়ের অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মেঘের সাথে হাত মেলাতে চাইলে বান্দরবান একটি আদর্শ গন্তব্য।
কেন যাবেন?
যারা পাহাড়ের টান অনুভব করতে চান, তাদের জন্য বান্দরবান যেন এক অলৌকিক ভূমি। সবুজ পাহাড়, ঝর্ণার শব্দ আর মেঘের স্পর্শ এখানে আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে।
কি দেখবেন?
নাফাখুম ঝর্ণার তীব্র সৌন্দর্য
নীলগিরি ট্যুরিস্ট স্পট (মেঘের রাজত্ব)
বগা লেক (বাংলাদেশের উচ্চতম লেক)
চিম্বুক পাহাড়ের সূর্যাস্ত
ভ্রমণ টিপস:
সকাল সকাল বেরিয়ে পাহাড় ভ্রমণ করলে কুয়াশায় মোড়া সুন্দর দৃশ্য পাবেন। নিরাপদ ভ্রমণের জন্য ভালো গাইড সঙ্গে রাখুন।
৯. পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। এখানে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন ও স্থাপত্যের অনন্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায়।
কেন যাবেন?
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য স্থান। এক সময় এখানে ছিলো এশিয়ার অন্যতম প্রধান বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র।
কি দেখবেন?
সোমপুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ
জাদুঘরে প্রাচীন মূর্তি ও নিদর্শন
হাজার বছরের পুরোনো স্থাপত্যশৈলী
ভ্রমণ টিপস:
শীতকালে (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময়। সঙ্গে হালকা খাবার ও পানি রাখুন।
১০. কুয়াকাটা: সাগরে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অনন্য দৃশ্যের এক

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত কুয়াকাটা একমাত্র সৈকত, যেখানে একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, ফাতরার চর, গঙ্গামতির চর এবং রাখাইন পল্লী দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রকৃতি আর শান্ত পরিবেশের এক অপূর্ব মিলনমেলা এখানে।
কেন যাবেন?
বাংলাদেশের একমাত্র স্থান, যেখানে একই সমুদ্র থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায় — তা হলো কুয়াকাটা!
কি দেখবেন?
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত
ফাতরার চর ও গঙ্গামতির চর
রাখাইন পল্লী দর্শন
কুয়াকাটার বনভূমি
ভ্রমণ টিপস:
সকালে সূর্যোদয়ের সময় সৈকতে উপস্থিত থাকতে চাইলে আগের রাতেই সেখানে থাকতে হবে। ক্যামেরা অবশ্যই সাথে রাখবেন—স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ধরে রাখার জন্য।
কেন এই জায়গাগুলো আপনার পরবর্তী গন্তব্য হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের এসব Tourist Places গুলো শুধু চোখের সৌন্দর্য নয়, মন এবং আত্মারও খাদ্য। এখানে আপনি পাবেন প্রকৃতির টানে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ, ইতিহাসের গন্ধ শোঁকার সুযোগ, আর নতুন মানুষ আর সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আনন্দ।
প্রতিটি গন্তব্যের নিজস্ব গল্প আছে—যা আপনাকে এক নতুন দুনিয়ায় নিয়ে যাবে।
